বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১, ১২:২৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

উদ্বোধনের অপেক্ষা সড়কপথেও জুড়ল পদ্মার দুই পার

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধিঃ / ৪৭ বার পঠিত
আপডেট : মঙ্গলবার, ২৪ আগস্ট, ২০২১, ৩:১৬ পূর্বাহ্ণ
উদ্বোধনের অপেক্ষা সড়কপথেও জুড়ল পদ্মার দুই পার

সকাল ১০টা ১২ মিনিট। শরতের খণ্ড খণ্ড সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে নীল আকাশে। শরীর জুড়ানো হাওয়া বইছে। পদ্মায় স্রোতের ভীষণ টান। তবে প্রকৃতির মনোহরী এ রূপের প্রতি খেয়াল নেই কারো। প্রমত্তা পদ্মার দুই পারকে সড়কপথে জুড়তে ক্রেনে ঝুলে থাকা শেষ রোডওয়ে স্ল্যাবটির দিকে সবার চোখ। ধীরে ধীরে স্ল্যাবটি পদ্মা সেতুর জায়গামতো বসামাত্র উল্লাসে মেতে উঠলেন দেশি-বিদেশি প্রকৌশলী ও নির্মাণ শ্রমিকরা।

এখন পিচ ঢালাই হলেই ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতল সেতুর সড়কপথটি যানবাহন চলাচলের উপযোগী হবে। এর আগে গত ২০ জুন সেতুর রেলপথের শেষ স্ল্যাবটি বসেছে। এখন চলছে রেললাইনের পাশে গ্যাসপাইপ বসানোর কাজ। আগামী জুনেই দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের এই সেতুর শুভ উদ্বোধনের আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গতকাল সোমবার শেষ স্ল্যাবটি বসানো উপলক্ষে চীনা ভাষায় একটি ব্যানার ঝোলানো হয়। তাতে লেখা ছিল : ‘আজ ৬.১৫ কিলোমিটার সড়কপথের কাজ সম্পন্ন হলো।’

আতশবাজি পুড়িয়ে, জাতীয় পতাকা হাতে আনন্দ করা প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের সঙ্গে শরিক হন পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম ও সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান মো. আব্দুল কাদের।

তাঁরা বললেন, চাইলেই এখন পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে গাড়ি নিয়ে এপার-ওপার যাওয়া যাবে। শেষ স্ল্যাবটি বসানোয় পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল সড়কপথ। সেতুর ১২ নম্বর খুঁটির ওপর এটি বসেছে। এর মধ্য দিয়ে দুই হাজার ৯১৭টি রোডওয়ে স্ল্যাবের সবই বসানোর কাজ শেষ হলো।

পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আব্দুল কাদের কালের কণ্ঠকে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানান এভাবে, ‘একটা বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিলাম। কারিগরি সব চ্যালেঞ্জ এখন শেষ। এই সেতুতে দেশের মানুষ সুফল ভোগ করলেই আমাদের সার্থকতা। খুব ভালো লাগছে আজ।’ আগামী বছরের জুনের আগেই সম্পূর্ণ কাজ শেষ করার আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সে লক্ষ্যে এখানে কর্মরত সবাই দিনরাত কাজ করে চলেছেন।

এর আগে পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকায় এসে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দিয়েছেন, ২০২২ সালের জুন মাসের যেকোনো দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সেতুর শুভ উদ্বোধন করবেন। সে সময় মন্ত্রী জানান, চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত সেতু প্রকল্পের সার্বিক কাজ এগিয়েছে ৮৭.২৫ শতাংশ। নদীশাসনের কাজের অগ্রগতি সাড়ে ৮৪ শতাংশ। আর মূল সেতুর কাজের অগ্রগতি ৯৪.২৫ শতাংশ।

দেওয়ান আব্দুল কাদের বলেন, সেতুর রোডওয়ে স্ল্যাবের ওপর পরীক্ষামূলক পিচ ঢালাইয়ের কাজ এরই মধ্যে জাজিরা প্রান্তে শেষ হয়েছে। মূল কাজ শুরু হবে আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে। এ কাজে তিন মাসের মতো সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।

সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি (এমবিইসি) সেতু বিভাগকে জানিয়েছে, তারা আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যেই সব কাজ শেষ করবে। সব মিলিয়ে আগামী মে মাসেই পদ্মা সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে সেতু বিভাগ জানিয়েছে, দিনক্ষণ ঠিক করা হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনার পর।

২০০১ সালে মাওয়া চৌরাস্তা বরাবর পুরনো ফেরিঘাটসংলগ্ন মসজিদের কাছে পদ্মা সেতুর ফলক উন্মোচন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর সরকার বদল হলে থেমে যায় কাজ। আবার ২০০৯ সালে তোড়জোড় শুরু হয় কাজের। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় পদ্মা সেতু। এরপর একে একে ৪২টি পিলারে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১টি স্প্যান বসানো হয়। ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু পুরোপুরি দৃশ্যমান হয় স্প্যান বসানো শেষের মাধ্যমে। একই সঙ্গে চলতে থাকে রোডওয়ে ও রেলওয়ে স্ল্যাব বসানোসহ অন্যান্য কাজ।

চলছে গ্যাসলাইন স্থাপনের কাজ : গত ১৯ আগস্ট থেকে সেতুতে গ্যাস পাইপ তোলা শুরুর পর শনিবার থেকে তা বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত আটটি পাইপ স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে সেতু কর্তৃপক্ষ বলছে, দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে বহুমাত্রিক পদ্মা সেতুর কাজ। সড়ক আর রেলের পর দক্ষিণাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে গ্যাস পাইপ বসানোর মধ্য দিয়ে। আগামী ডিসেম্বরেই গ্যাসলাইন বসানোর কাজ শেষ হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রতিটি গ্যাস পাইপের ওজন সাড়ে পাঁচ টন। ক্রেনে করে সেতুর ওপর ওঠানো হচ্ছে। সেতুর নিচতলায় রেলের পূর্ব পাশেই বসানো হচ্ছে এসব পাইপ। সেতুর ১ ও ৪২ নম্বর খুঁটি দিয়ে মাটিতে নামিয়ে আনা হবে। যুক্ত হবে জিটিসিএলের সাবস্টেশনে। দুই প্রান্তে দুটি সাবস্টেশন থাকবে। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ হয়ে লাঙ্গলবন্দ থেকে মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর হয়ে এই গ্যাস যুক্ত হবে মাওয়া গ্যাস সাবস্টেশনে। এখান থেকেই গ্যাস যাবে দক্ষিণাঞ্চলে।

সাতটি মডিউলে ভাগ করে সেতুতে ৬.৭০ কিলোমিটার গ্যাস পাইপ বসানোর লক্ষ্যে সেতুর ৪২ থেকে ৩৭ নম্বর খুঁটি পর্যন্ত ৭ নম্বর মডিউলে গ্যাস পাইপ বসানো শুরু হয়েছে। ৭৬২ মিলিমিটার ডায়া এবং ২৫.৪০ মিলিমিটার ওয়াল থিকনেসের ১২ মিটার দীর্ঘ ৫৩১টি পাইপে ৬.১৫ কিলোমিটার মূল সেতুতে গ্যাসলাইন বসানো হচ্ছে। কাজটি করছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি লিমিটেড। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। পদ্মা সেতুতে প্রাকৃতিক গ্যাসলাইন স্থাপনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প পরিচালক সুন হুন্ডু জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পাইপলাইন স্থাপন সম্ভব হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর পড়ুন
Theme Customized By Theme Park BD